মুক্তিযুদ্ধের সমৃদ্ধ ইতিহাসের ভান্ডার ‘পুলিশ জাদুঘর’

মুক্তিযুদ্ধের সমৃদ্ধ ইতিহাসের ভান্ডার ‘পুলিশ জাদুঘর’

Spread the love

প্রথম কন্ঠ: রাজধানীর রাজারবাগে অবস্থিত পুলিশ জাদুঘর এই সময়ে সত্য-মিথ্যা বহু অভিযোগ শোনা যায় পুলিশের বিরুদ্ধে। অথচ এই পুলিশই প্রথম ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মর্টার শেল, কামান, ট্যাংক ও ভারী অস্ত্রের বিরুদ্ধে লড়েছিল জীবন বাজি রেখে। শুধু ‘থ্রি নট থ্রি’ রাইফেল দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। দেশের জন্য শহিদ হয়েছিল। আজকে এসে সেই ইতিহাস মনে রাখেনি কেউ। অনেকেই ভুলে গেছেন মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের সেই গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। তাই নতুন প্রজন্মের মধ্যে সে ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে গড়ে তোলা হয়েছে ‘বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’। অত্যন্ত নান্দনিক শিল্পশৈলীতে দেড় বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই জাদুঘরে ঢুকলে প্রথমেই দেখা যাবে বঙ্গবন্ধু গ্যালারি। গ্যালারির দু’পাশের দেয়ালে রয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নানা সময়ের দুর্লভ ছবি। পাশেই আছে মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা প্রায় দুই হাজার বইয়ের সমন্বয়ে একটি মনোরম লাইব্রেরি। যে কেউ লাইব্রেরিতে বসে এই বইগুলো পড়তে পারবেন। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের অবদান বিষয়ে লেখা বই এখান থেকে কিনতেও পারবেন। বঙ্গবন্ধু গ্যালারির ঠিক মাঝ বরাবর একটি গোলাকার সিঁড়ি নেমে গেছে জাদুঘরের মূল কক্ষে। সেখানে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বিশাল সংগ্রহশালা। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন, মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ব্যবহার করা বিভিন্ন অস্ত্র এবং পোশাক, এমনকি বিপস্নবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ব্যবহার করা ৩৮ বোর রিভলভারটিও আছে এই জাদুঘরে। জাদুঘরের মূল কক্ষে প্রবেশ করলেই শোনা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গান। এ ছাড়া রয়েছে একটি অডিওভিজুয়াল গ্যালারি। যেখানে আছে দর্শনার্থীদের জন্য ২৫ মার্চের কালরাতে প্রথম প্রতিরোধের ওপর নির্মিত ৪০ মিনিটের একটি ডকুমেন্টরি দেখার ব্যবস্থা। ২৫ মার্চের সেই কালরাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধে ব্যবহৃত থ্রি নট থ্রি রাইফেল, শহিদ পুলিশ সদস্যদের ব্যবহৃত পোশাক, চশমা, টুপি, বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণার টেলিগ্রাম লেটার এখানে সংরক্ষণে রয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আইজিপি আবদুল খালেকের ব্যবহৃত চেয়ার, যুদ্ধের সময় উদ্ধার করা গুলি, ব্যবহৃত হ্যান্ডমাইক এবং দূর থেকে শত্রুর অবস্থান দেখার জন্য পুলিশ বাহিনীর সার্চলাইটও স্থান পেয়েছে এখানে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের টেলিকম ভবনের দেয়ালঘড়ি, যুদ্ধকালীন পুলিশ সদস্যদের বিভিন্ন চিঠিপত্র, ২৫ মার্চ রাতে যে বেতার যন্ত্রের মাধ্যমে সারাদেশে পুলিশ সদস্যদের রাজারবাগ আক্রমণের খবর দেওয়া হয়েছিল, সেই হেলিকপ্টার ব্যাজ বেতার যন্ত্র, ওয়্যারলেস সেট, প্রথম প্রতিরোধের রাতে যে পাগলা ঘণ্টা বাজিয়ে পুলিশ সদস্যদের একত্রিত করা হয়েছিল, সেই পাগলা ঘণ্টাটিও আছে জাদুঘরে। রাজধানীর শাহজাহানপুর থেকে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র তৌশিক ফয়সাল রিয়াদ এসেছিল পুলিশ জাদুঘর দেখতে। সে বলে, ‘আমার দাদা শামসুর রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। বাবার কাছে মুক্তিযুদ্ধের অনেক গল্প শুনেছি। তাই এই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর দেখতে এসেছি।’ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পরিচালক এসপি আবিদা সুলতানা বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি পুলিশ সদস্যদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকাকে নতুন প্রজন্ম এবং বিশ্ববাসীর মধ্যে ছড়িয়ে দিতে, যুদ্ধে পুলিশের স্মৃতিচিহ্নকে ধরে রাখতে এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস এবং পুলিশ সদস্যদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। দর্শনার্থীদের জন্য গ্রীষ্মকালে (মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৬টা এবং শীতকালে (অক্টোবর থেকে ফেব্রম্নয়ারি) সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত জাদুঘরটি খোলা থাকে। বুধবার এর সাপ্তাহিক বন্ধ। এ ছাড়া শুক্রবার বিকাল ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে জাদুঘরটি। এর প্রবেশ মূল্য ১০ টাকা। তবে ডিসেম্বরে শিক্ষার্থীদের জন্য এবং সব জাতীয় দিবসে সবার জন্য বিনামূল্যে এই জাদুঘর দেখার ব্যবস্থা রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন




All rights reserved © Prothom Kantho
Design BY Code For Host, Inc