প্রচারণা শেষ ॥ যান চলাচলে বিধি নিষেধ : ঢাকায় কাল ভোট

প্রচারণা শেষ ॥ যান চলাচলে বিধি নিষেধ : ঢাকায় কাল ভোট

Spread the love

স্টাফ রিপোর্টার,প্রথমকণ্ঠ: আগামী কাল শনিবার ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে গত রাত থেকে সব ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা শেষ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। গোটা নির্বাচনই ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) এর মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু শঙ্কা কাটেনি ভোটারদের।

এই দুই সিটিতে নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ইভিএমে ভোট প্রদান নিয়ে নানা ধরনের শঙ্কা ও ভয় কাজ করছে। নির্বাচনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির পক্ষ থেকে ইভিএম এ ভোট নেয়ার বিষয়ে আপত্তি জানালেও আওয়ামী লীগের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। ইতোমধ্যে কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে ইভিএম। নিরস্ত্র সেনা সদস্যদের তত্ত্বাবধানে এসব ইভিএম পরিচালিত হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিভিন্ন কেন্দ্রে পরীক্ষামূলক মক ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এসব মক ভোটে ভোটারদের আগ্রহ ছিল অনেক কম। আগামীকালের ভোটকে কেন্দ্র করে গোটা ঢাকায় সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। যান চলাচলের উপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আইনশৃংখলা নিয়ন্ত্রণে বিজিপির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে রয়েছেন। সেই সাথে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরাও মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন।

ইসি সূত্র মতে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মোট সাধারণ ওয়ার্ড সংখ্যা ৫৪টি ও সংরক্ষিত ওয়ার্ড ১৮টি। এই সিটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৩০ লাখ ১০ হাজার ২৭৩ জন। এখানে সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র রয়েছে এক হাজার ৩১৮টি ও ভোটকক্ষের সংখ্যা সাত হাজার ৮৪৬টি।

দক্ষিণ সিটিতে মোট সাধারণ ওয়ার্ড ৭৫টি এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ড ২৫টি। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৪ জন। সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র রয়েছে এক হাজার ১৫০টি এবং ভোটকক্ষ ৫৫৮৮টি।

এ সকল কেন্দ্রে ইতোমধ্যে ইভিএমসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছে গেছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সব ভোটকেন্দ্র সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটের আগের দিন ও ভোটের দিন এবং গতকাল মক ভোটের দিনসহ মোট তিনদিন সিসিটিভি ক্যামেরায় প্রত্যেক কেন্দ্রের চিত্র ধারণ করা হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে সিটি নির্বাচনের প্রচারণা শেষ হয়েছে। বিধি অনুযায়ী, ভোটের ৩২ ঘণ্টা আগে প্রচারণায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ১ ফেব্রুয়ারি দুই সিটিতে ভোট। ওইদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হবে। গতকাল থেকেই বিজিবি মাঠে টহল দিতে শুরু করেছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আবুল কাসেম বলেন, বিজিবির সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তারা বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকেই বিজিবি সদস্যরা মাঠে থাকবেন। শুধু তারাই নয়, এদিন থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটও মাঠে থাকবেন। প্রতিটি ওয়ার্ডের জন্য একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং দুইটি ওয়ার্ডের জন্য একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট থাকছেন।

আবুল কাসেম বলেন, বৃহস্পতিবার রাত ১২টা পর্যন্ত প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবেন। এরপর যদি কোনো প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণা চালায় সেক্ষেত্রে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।

ইসি সূত্র জানায়, ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ৬৫ প্লাটুন বিজিবি মাঠে থাকবে। তারা ভোটের আগে ও পরে মোট চারদিন দায়িত্ব পালন করবেন। এবারের নির্বাচনে সব বাহিনী মিলে মোট ৫০ হাজারের মতো ফোর্স নিয়োজিত থাকবে।

ভোটের দুইদিন আগে ৩০ জানুয়ারি থেকে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার দিনের জন্য দায়িত্ব পালন করবে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স। দুই সিটির ভোটকে সামনে রেখে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন’ সংক্রান্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে এ তথ্য জানানো হয়।

এ নির্বাচনে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও ভিডিপি নিয়োগে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাধারণ কেন্দ্রে ১৬ জন করে ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ১৮ জন করে নিরাপত্তা সদস্য নিয়োজিত থাকবে। মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্সের দায়িত্ব পালন করবে পুলিশ, এপিবিএন, ব্যাটালিয়ন আনসার, বিজিবি ও র‌্যাব। ইভিএমের কারিগরি সহায়তায় প্রতি ভোটকেন্দ্রে দুইজন করে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য নিয়োগ থাকবে।

নারী ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ভোটারদের নিরাপদে, নির্বিঘেœ ও স্বাচ্ছন্দ্যে ভোট দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় সহায়তা করবে। ৩০ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সধারীদেরও আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন ও আগ্নেয়াস্ত্রসহ চলাচল নিষিদ্ধ থাকবে।

যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন সামনে রেখে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে ঢাকার রাস্তায় মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

অপরদিকে শুক্রবার দিবাগত মধ্যরাত ১২টা থেকে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বেবি ট্যাক্সি/অটো রিকশা, ট্যাক্সি ক্যাব, মাইক্রোবাস, জিপ, পিকআপ, কার, বাস, ট্রাক, টেম্পু, অন্যান্য যন্ত্রচালিত যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে।

মোটরসাইকেল চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

ইতোমধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে যান চলাচলের উপর বিধি-নিষেধ আরোপ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

ইসির পরিপত্র : শেষ পন্থা হিসেবে পদক্ষেপ নেবে সেনা

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারে কারিগরি সহায়তা দেবেন সশস্ত্র বাহিনীর পাঁচ হাজারের বেশি নিরস্ত্র সদস্য। যারা দায়িত্ব পালন করবেন সব ভোটকেন্দ্রে।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, ভোটের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন থাকবে না।

কিন্তু ইভিএম পরিচালনায় দায়িত্বরত নিরস্ত্র সেনা সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে সশস্ত্র বাহিনী সব পদক্ষেপ নিতে পারবে। এক্ষেত্রে সেনাক্যাম্প স্থাপন অথবা প্রশাসনিক সুবিধাদানকারী ডিভিশনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে। ইভিএম বিষয়ক এক বিশেষ পরিপত্র জারি করে এমন নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

ইসির উপ-সচিব আতিয়ার রহমান স্বাক্ষরিত পরিপত্রের ১৭ ধারায় বলা হয়েছে, ভোট গ্রহণের দিন কেন্দ্রে অবস্থানরত কারিগরি সহায়তা দেওয়া সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা নিরস্ত্র থাকবেন। রিটার্নিং অফিসার/সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও ক্ষেত্রমতে প্রিজাইডিং অফিসার, ভোটকেন্দ্রে অবস্থানকারী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও টহল কাজে নিয়োজিত পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবির সহায়তায় উক্ত সশস্ত্র বাহিনীর কারিগরি সদস্যদের যাবতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন।

‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য সশস্ত্র বাহিনীর কারিগরি সদস্যরা মোবাইল ফোন বহন করতে পারবেন। উল্লিখিত ব্যবস্থা ছাড়াও যে কোনো প্রকার অনাকাঙ্খিত ঘটনা প্রতিরোধ এবং তাদের নিরাপত্তা বিধানকল্পে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সবশেষ পন্থা হিসেবে সেনাক্যাম্প স্থাপন করে অথবা প্রশাসনিক সুবিধাদানকারী ডিভিশনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে নিরাপত্তা নিশ্চিত সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে পারবেন।’

পরিপত্রটি দুই সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। যার অনুলিপি দেওয়া হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগের সিনিয়র সচিবকেও।

এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগও পরিপত্র জারি করে এমনটি বলেছিল।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিলের ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে তিন ব্যাটালিয়ন সেনা ভোটের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মোতায়েন করা হয়েছিল। তবে তারা ক্যান্টনমেন্টেই প্রস্তুত অবস্থায় ছিলেন। সে নির্বাচনে কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা না ঘটায় ক্যান্টনমেন্ট থেকে ভোটের মাঠে নামতে হয়নি তাদের।

ভোটারের তথ্য পাওয়া যাবে অ্যাপসে

ভোটারের ভোট কেন্দ্র খুঁজে পাওয়ার জন্য একটি মোবাইল অ্যাপস চালু করেছে নির্বাচন কমিশন। অ্যাপসটি ডাউনলোড করতে যঃঃঢ়ং://ংবৎারপবং.হরফ.িমড়া.নফ/ৎবংড়ঁৎপবং/ভড়ৎসং/চড়ষষরহমঈবহঃবৎ.ধঢ়শ লিংক-এ ক্লিক করুন।

এছাড়াও তথ্য পেতে নিচের যে কোন একটি পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে:

একজন ভোটার নিজ ভোট কেন্দ্র খুঁজে পেতে মোবাইলের এসএমএস অপশনে গিয়ে ‘চঈ<ঝঢ়ধপব> ঘওউ নম্বর’ লিখে ১০৫-এ প্রেরণ করলে ফিরতি এসএমএসে ভোটারের কাঙ্ক্ষিত ভোট কেন্দ্রের নাম ও ভোটার নম্বর পেয়ে যাবেন। (চঈ<ঝঢ়ধপব>১২৩৪৫৬৭৮৯০ ঝবহফ ঃড় ১০৫)।

নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে গিয়ে ভোটারগণ তাদের ভোট কেন্দ্র সম্পর্কে জানতে পারবেন। এজন্য নির্বাচন কমিশনের এনআইডি উইং এর ওয়েবসাইট ভোটার ও ভোট কেন্দ্রের তথ্য এ ঢুকে ভোট কেন্দ্র ও ভোটার নম্বর সম্পর্কে তথ্য জানা যাবে।

এছাড়াও নির্বাচন কমিশনের কলসেন্টার ১০৫ এ সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কল করে ভোটাররা ভোটকেন্দ্র সম্পর্কে জানতে পারবেন।

মক ভোটে সাড়া কম

ভোট হতে আরও একদিন বাকি, তার আগেই ভোটকেন্দ্রে ভোটার, দিলেন ভোটও! ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারে ভোটারদের অভ্যস্ত করতেই অনুশীলনমূলক (মক) ভোটের আয়োজন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে এতে ভোটারদের আগ্রহ খুব কম।

গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ধানমন্ডি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রে দেখা যায় মক ভোটের দৃশ্য। এদিন দুপুরের পর এ কেন্দ্রে বেশ কয়েকজন ভোটার মক ভোট দিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

মক ভোট দিতে এসে এ এলাকার বাসিন্দা সোহেল আহমেদ একটি মেশিনে হাতের বুড়ো আঙুলের ছাপ দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে মেশিনটির স্ক্রিন এবং কক্ষের দেয়ালে ভেসে উঠলো ভোটারের ছবি, ভোটার নম্বর ইত্যাদি। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং কক্ষে উপস্থিত সবাই দেখলেন ভোটারের বিস্তারিত। এরপর ভোটার চলে গেলেন ভোট দেওয়ার গোপন কক্ষে। সেখানে রয়েছে আরেকটি মেশিনের প্যানেল। সেই প্যানেলে রয়েছে তিনটি ভাগ। এক ভাগে মেয়র প্রার্থী, অন্য দুই ভাগে কাউন্সিলর প্রার্থীদের নাম-প্রতীকের তালিকা। প্যানেলে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে বেরিয়ে গেলেন ভোটার।

ভোটাররা জানালেন, মেশিনের মাধ্যমে ভোট দেওয়াটা সবার কাছে নতুন। অনেকের কাছে বিষয়টি ভীতিকরও। তবে যারা মগ ভোটে অংশ নিয়েছেন তাদের সেই ভয় কেটে গেছে।

সংবাদটি শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন




All rights reserved © Prothom Kantho
Design BY Code For Host, Inc