সখীপুরে অবাদে দখল হচ্ছে বনের জমি

সখীপুরে অবাদে দখল হচ্ছে বনের জমি

নিজস্ব প্রতিনিধি : টাঙ্গাইলের সখীপুরে দিনরাত দখল হচ্ছে সংরক্ষিত ও সামাজিক বনের জমি। একে একে উপজেলায় প্রায় সাড়ে ১২ হাজার একর  সংরক্ষিত ও সামাজিক বনের জমি  হয়ে গেছে বেদখল। আর এসব দখলের তালিকায় বিভিন্ন শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, এনজিও, বাজারসহ হাজারো ব্যক্তির নাম রয়েছে। যুগ যুগ ধরে  বনের জমি দখল হওয়ায় একদিকে যেমন প্রাকৃতিক ভারসাম্যের প্রধান উপাদান বনভূমি উজাড় হচ্ছে । ধ্বংস হচ্ছে প্রকৃতিক  পরিবেশ। হারিয়ে যাচ্ছে বন্য প্রাণী ও বনের কীটপতঙ্গ।

বন বিভাগ বলছে, এ বনভূমি একদিনে  দখল হয়নি। দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, বসতবাড়ি ও পোল্ট্রি ফার্ম গড়ে তুলে এসব জমি জবরদখল করেছেন। এখন জবরদখল হওয়া জমিগুলো পর্যায়ক্রমে উদ্ধার করে তা বন বিভাগের দখলে নেওয়া চেষ্টা করা হচ্ছে।

উপজেলায় বন বিভাগের বহেড়াতৈল রেঞ্জে ৫টি, হতেয়া রেঞ্জে ৫টি, বাঁশতৈল রেঞ্জে ১টিসহ মোট ১১টি বিট কার্যালয়ের অর্ধশত কর্মকর্তা, বন প্রহরী বন ও বনভূমি রক্ষায় নিয়োজিত থাকলেও  নানা অজুহাতে দখল ঠেকাতে পারছেন না তারা । তবে বন কর্মকর্তাদের দাবি, কিছু কিছু জমি উদ্ধার করে সামাজিক বনায়ন করা হচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে উপজেলায় আনুমানিক ২০০ একর বেদখল জমি উদ্ধার করে বন বিভাগের দখলে আনা হয়েছে।

বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বহেড়াতৈল রেঞ্জের ৫টি বিট কার্যালয়ের আওতায় ২০ হাজার ৮৭৮ দশমিক ৭৬ একর গেজেটভুক্ত বনভূমি রয়েছে। এর মধ্যে বেদখলে  আছে ৪ হাজার ২৬৪ দশমিক ৩৬ একর। হতেয়া রেঞ্জের ৫টি বিটের আওতায় ১৪ হাজার ৮৬৮ দশমিক ৩৭ একর গেজেটভুক্ত বনভূমির ৭ হাজার ১১৩ দশমিক ৬৩ একরই বেদখলে রয়েছে। বাঁশতৈল রেঞ্জের ৫টি বিটের মধ্যে শুধু নলুয়া বিটটি সখীপুর উপজেলায় পড়েছে। এই বিটের আওতায় ২ হাজার ৪০০ একর বনভূমির মধ্যে প্রায় ১ হাজার একর ভূমি বেদখলে রয়েছে। উপজেলার সীমানার মধ্যে ১১টি বিটে প্রায় ৩৮ হাজার বনভূমির মধ্যে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার ভূমি বেদখলে। মোটের কথা সখীপুরের মোট বনভূমির তিন ভাগের এক ভাগ দখলে আর দুই ভাগই বন বিভাগের বেদখলে চলে গেছে ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশ স্বাধীনের পর থেকে  জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বসতবাড়ি বৃদ্ধি পেয়েছে। ওইসব বসতবাড়ির বেশির ভাগই স্থানীয় বন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে বন বিভাগের জমিতে বাড়িঘর করতে শুরু করেন।  প্রথমে একটি  পরে আস্তে আস্তে ওই বাড়িতে জনসংখ্যার চাপে  চার-পাঁচটি ঘর করে তৈরি করেছে ওই বনের জমি দখল করেই।  এভাবেই জনসাধারণের প্রয়োজনে বনের জমিতে বাড়িঘর, মসজিদ-মন্দিরসহ বিভিন্ন উপাসনালয় গড়ে তোলেন। পর্যায়ক্রমে বাজার, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বনের জমি দখল করে স্থাপিত হয়।

সম্প্রতি বহেড়াতৈল রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে রেঞ্জের জমির নকশা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বহেড়াতৈল মৌজার নকশার ৭ নম্বর সিটের ১৫২৯ দাগে বনের জমির পরিমাণ ২০৯ দশমিক ৬০ একর। ওই দাগে আনুমানিক ১০০ একর জমি বন বিভাগের দখলে নেই। এই জমি কে কে দখলে রেখেছেন, এমন প্রশ্নে রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ বলেন, দাগের বেশির ভাগ জমিই সখীপুর পৌরসভার সীমানায়। ফলে জমির মূল্য অনেক বেশি। বর্তমানে এ জমিতে কয়েক শ বাসাবাড়ি, সিএমইএস নামের একটি বেসরকারি সংস্থার বিজ্ঞান আনন্দকেন্দ্র, কেন্দ্রীয় স্মৃতিসৌধ, একটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেশ কয়েকটি  মসজিদ,  মাদ্রাসা,  ফুটবল মাঠসহ অনেক স্থাপনা  গড়ে তোলা হয়েছে।

সখীপুর আবাসিক মহিলা কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রধান মো. লুৎফর রহমান বলেন, সংরক্ষিত ও সামাজিক বনের গাছপালা কেটে যেভাবে বাজারসহ নানা স্থাপনা বসানো হচ্ছে। এতে দিনদিনই  বন উজাড় হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য।

বাঁশতৈল রেঞ্জের আওতাধীন নলুয়া বিট কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল ইসলাম নিউজ টাঙ্গাইলকে বলেন, তাঁর এলাকায় প্রায় ২০ বছর আগে প্রায় দুই একর জমি দখল করে এয়ারফোর্স বাজার নামে একটি বাজার হয়েছে। এখন ইচ্ছা করলেও এই বাজার বন বিভাগের দখলে নেওয়া সম্ভব নয়। বন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বনের জমি দিন দিন দখল হচ্ছে, এমন অভিযোগ অস্বীকার করে হতেয়া রেঞ্জের কর্মকর্তা মো. আবদুল ওয়াদুদ বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে অনেক বেদখলীয় জমি উদ্ধার করে সেখানে বনায়ন করেছি।’বনের এত জমি বেদখল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একদিনে এসব জমি বেদখল হয়নি। একটু একটু করে দীর্ঘ দিনে এসব জমি বেদখল হয়েছে।

টাঙ্গাইল বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) জহিরুল ইসলাম  প্রথম কণ্ঠকে বলেন, ‘বেদখল হওয়া বনের জমিগুলো পর্যায়ক্রমে উদ্ধার করে তা বন বিভাগের দখলে নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২০০ হেক্টর জমি আমরা দখলমুক্ত করে সেখানে সামাজিক বনায়ন করতে সক্ষম হয়েছি।’

সংবাদটি শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন




All rights reserved © Prothom Kantho
Design BY Code For Host, Inc