করোনার প্রভাব সখীপুরে কুইচ্চা ব্যবসায় ধস

করোনার প্রভাব সখীপুরে কুইচ্চা ব্যবসায় ধস

Spread the love

এস এম জাকির হোসেন : চীনে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় সখীপুরে কুইচ্চা রফতানি বাণিজ্যে ধস নেমেছে। প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কুইচ্চা উৎপাদনে নিয়োজিত প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা পথে বসার উপক্রম হয়েছে। কুইচ্চা খামারে দেখা দিয়েছে মড়ক। ফলে আমদানি রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় লক্ষ লক্ষ টাকার ব্যাবসায়ীক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে উপজেলার কুইচ্চা ব্যবসায়ীরা। কুইচ্চা সংগ্রহকারী ও ব্যবসার সাথে জড়িত অন্তত দুই শতাধিক পরিবার ব্যাংক ঋণ ও দাদন পরিশোধ নিয়ে পড়েছেন বিপাকে।

সখীপুর উপজেলার কুইচ্চা ব্যবসায়ী আজাহার আলী, শ্রী সন্তুস কোচ ও সুভল চন্দ্র কোচ দৈনিক প্রথমকণ্ঠকে জানান, উপজেলা থেকে আগে প্রতিমাসে অন্তত প্রায় একুশ লক্ষ টাকার কুইচ্চা রপ্তানি হতো ঢাকায়। বিশেষ করে রপ্তানির তালিকায় থাকা চীনেই রপ্তানি হতো ৯০শতাংশ কুইচ্চা। বাকী ১০শতাংশ রপ্তানি করা হতো হংকং, তাইওয়ানসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে। ফলে এই ব্যবসার সাথে জড়িতরা ভাগ্য বদল করেছিল অনেক পরিবারই। চীনের নাগরিকদের দৈনন্দিক খাদ্য তালিকায় কুইচ্চা ছিল অন্যতম একটি জনপ্রিয় খাদ্য। কিন্তু দেশটিতে সম্প্রতি করোনা ভাইরাস মারাত্মক আকারে বিস্তারের কারণে চলতি বছরের ২০জানুয়ারি থেকে চীনের সাথে কুইচ্চা রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সখীপুর উপজেলার কুইচ্চা সংগ্রহকারী, ব্যবসায়ী ও রপ্তানির কাজের সাথে জড়িত অন্তত দুই শতাধিক পরিবার। ব্যবসায়ীরা জানান, তারা আগে মাছ ব্যবসা করতেন। আবার অনেকে ছিলেন বেকার। ব্যবসার জন্য ঢাকা আসা-যাওয়ার সূত্র ধরে যোগাযোগ হয় ঢাকার উত্তরার টঙ্গীর কামারপাড়া ও নলভোগ এলাকার অর্কিড ট্রেডিং কর্পোরেশন, আঞ্জুম ইন্টারন্যাশনাল ও গাজী এন্টারপ্রাইজসহ অন্যান্য কুইচ্চা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সাথে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে তাদের সংগ্রহ করা কুইচ্চা বিদেশে রপ্তানি করে আসছিলেন তারা। রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় কুইচ্চা ব্যবসার সম্প্রসারনের জন্য স্থানীয় কুইচ্চা ব্যবসায়ীদের দাদনে টাকা দিতেন। ওই সকল প্রতিষ্ঠান থেকে সখীপুর কুইচ্চা ব্যবসায়ীরা এক থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত দাদনে (সুদে বা তাদের কাছে কুইচ্চা বিক্রির শর্তে) গ্রহন করতেন। রপ্তানি কারকদের কাছে কুইচ্চা বিক্রির মাধ্যমে দাদনের টাকা পরিশোধ করতেন ব্যবসায়ীরা। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ পেশার সাথে জড়িয়ে নিজেদের ভাগ্য ফিরিয়েছে উপজেলার সহস্রাধিক পরিবার। কুইচ্চা আহরন ও বিক্রয়ের সাথে জড়িয়ে তারা এখন স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার কীর্ত্তন খোলা,কালিয়ান পাড়া, কালিদাশ,নলুয়া,মহানন্দপুর, পাথার, ইছাদিঘীসহ বিভিন্ন এলাকায় কুইচ্চা সংগ্রহ হয় বেশি। সাধারণত জলাবদ্ধ এলাকা গুলোতে কুইচ্চা বেশী পাওয়া যায় বলে কুইচ্চা শিকারীরা জানান। অঞ্চল ভেদে কুঁচিয়া, কুঁচে, কুইচ্চা, বাইন নামেই পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম মনোপটেরাস। কুইচ্চা ৬০ থেকে ৭০ সেন্টি মিটার লম্বা হয়। অ-গভীর খাল- বিল, হাওর-বাওর, পুকুর ও মাটির নিচে আবাস এদের। কুইচ্চা রাক্ষুসে স্বভাবের। খাদ্য হিসেবে প্রধানত ছোট মাছ তাদের প্রধান খাবার হলেও শামুকও অন্যতম খাবার। তাই কুইচ্চা খেতেও বেশ সুস্বাদু হওয়ায় স্থানীয়ভাবেও কুইচ্চা বেশ চাহিদা রয়েছে। এটাকে মাছ হিসেবেই গ্রহন করছেন স্থানীয়রা। এমনকি ডাক্তাররা রক্ত শুন্যতার জন্য রোগীদের ব্যবস্থাপত্রের সাথে কুইচ্চা খাবারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তাই বিদেশেও রয়েছে কুইচ্চার ব্যাপক চাহিদা। বিদেশে কুইচ্চার ব্যাপক চাহিদা থাকায় বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে ব্যাপকভাবে। এভাবেই স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে কুইচ্চার বাজারের ক্রমবিকাশ ঘটিয়ে কুইচ্চা শিকারী, মজুদ ও ব্যবসার মাধ্যমে অন্তত দুই শতাধিক পরিবার স্বচ্ছলতায় জীবিকা নির্বাহ করে আসছিল। করোনা ভাইরাস মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ায় চীনের সাথে অন্যান্য ব্যবসা বানিজ্যর মতো কুইচ্চা রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়েছে দাদন নেয়া কুইচ্চা সংগ্রহকরী ও ব্যবসায়ীরা। বেকার হয়ে পড়েছে কুইচ্চা ধরা শ্রমজীবী লোকজন। কিছুদিন আগেও রপ্তানিযোগ্য কুইচ্চা সংগ্রহ ও রপ্তানির জন্য যে আড়ৎগুলো ছিল কর্মচঞ্চল আজ সেখানে শুধু শুন্যতা। জনশুন্য হয়ে পড়েছে কুইচ্চা আড়ৎগুলো। কাজ না থাকায় অলস শ্রমিকদের বেতনের জন্য ব্যবসায়ীদের গুনতে হচ্ছে মাসিক বেতন। আগামী এক মাসের মধ্যে চীনে রপ্তানি কার্যক্রম পুনরায় শুরু না হলে ব্যবসায়ীদের মজুদ করা কুইচ্চা সম্পূর্ণ মারা যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। রপ্তানি বন্ধ থাকায় কুইচ্চা সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে কুইচ্চা কিনতে চাচ্ছেন না আড়ৎদাররা। যে কারনে বেশিরভাগ গরীব জেলে এখন কুইচ্চা ধরা বন্ধ করে দিয়েছেন। আর্থিক অনটনের মধ্যে জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে ওই সকল পরিবারের লোকজন। নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত কুইচ্চার মৌসুম থাকলেও জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারী দু”মাস কুইচ্চার প্রাপ্তীর ভরা মৌসুম। কিন্তু ভরা মৌসুমের শুরুতেই করোনা ভাইরাসের কারনে কুইচ্চা ব্যবসায় পুরোপুরি ধ্বস নামায় মহা বিপাকে পড়েছেন কুইচ্চা ধরা শ্রমিক, ব্যবসায়ি, আড়ৎদারসহ সংশ্লিষ্ট কাজের শ্রমিকরা। কুইচ্চা সংগ্রহকারী কালিদাশ গ্রামের রতন চন্দ্র কোচ জানান, আগে আড়ৎদারদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে পুকুর, ডোবা-নালা, খাল-বিল থেকে কুইচ্চা ধরে ৫শ থেকে ৭শ টাকা পর্যন্ত আয় করতাম। বর্তমানে রপ্তানী বন্ধ হওয়ায় কোন আড়ৎদার কুইচ্চা কিনতে চাচ্ছে না। তাই তাদের সংসার চালানো এখন খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।

চলচিত্র পরিচালক নিরঞ্জন বিশ্বাস দৈনিক প্রথমকণ্ঠকে বলেন: আমার কালিদাস এলাকায় অনেক বেকার ছেলেরা কুইচ্চা সগ্রংহ করে আড়তে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিল। অন্যান্য ব্যবসা বানিজ্যর মতো কুইচ্চা রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়েছে দাদন নেয়া কুইচ্চা সংগ্রহকরী ও ব্যবসায়ীরা। বেকার হয়ে পড়েছে কুইচ্চা ধরা শ্রমজীবী লোকজন।

সখীপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম দৈনিক প্রথমকণ্ঠকে বলেন, করোনা সংক্রমণের জন্য চীনে কুইচ্চা আমদানী বন্ধ করে দিয়েছে। যে কারনে এলাকার কুইচ্চা ব্যবসায় ধ্বস নেমেছে। এই উপজেলার বহু মৎস চাষীরা মজা পুকুর, ডোবা-নালা, খাল থেকে কুইচ্চা সংগ্রহ করে আড়তে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিল। তারপরেও কুইচ্চা সংগ্রহ, রক্ষণাবেক্ষণ ও বিক্রির সাথে জড়িত থেকে অসংখ্য মানুষ কর্মজীবনের মাধ্যমে আর্থিক সচ্ছলতায় দিনযাপন করতেন। সম্প্রতি চীনে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় কুইচ্চা রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে কারও কিছু করার নেই। তারপরেও আমরা আশা করছি এটি একটি সাময়িক সমস্যা। আমরা ধারণা করছি অচিরেই এ সমস্যাটি দূর হয়ে যাবে। তবে মজুদকৃত কুইচ্চা আমাদের দেশীয় বাজারে বিক্রি করলেও একটু হলেও লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পাবে কুইচ্চা সংগ্রহকারী জেলে ও আড়ৎদাররা।

সংবাদটি শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন




All rights reserved © Prothom Kantho
Design BY Code For Host, Inc