কেমন আছেন উনি?

কেমন আছেন উনি?

এস এম জাকির হোসেন : গতবছর ১৩ ডিসেম্বর দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক আবুল আসাদ গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে অনলাইন, অফলাইনে পরিচিত অপরিচিত সবার প্রশ্ন, সবার উদ্বেগ, ভাল আছেন তো উনি? ছাড়া পেলেন কি? এই বয়সে জেলে, সুস্থ আছেন তো? ছাড়া পাবেন কবে?

যারা দোয়া করছেন এবং উৎকণ্ঠায় আছেন তাদের জন্য নিচে কয়েকটি পর্বে উনার অবস্থার কথা জানাচ্ছি:

গত ১৩ই ডিসেম্বর চরমপন্থি সন্ত্রাসীদের আক্রমণ থেকে উদ্ধার করে পুলিশ তাঁকে থানায় নিয়ে যায়।

– সবাই ভেবেছিল, এইতো কিছুক্ষণ পরে পরিস্থিতি একটু নিরাপদ হলেই উনাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।

– কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে পরের দিন, ১৪ তারিখে, ডিজিটাল এক্টে গ্রেফতার দেখিয়ে তাঁকে সিএমএম কোর্টে হাজির করা হল এবং তিনদিনের রিমান্ডে নেওয়া হল।

– তিন দিনের রিমান্ড শেষে ১৮ ডিসেম্বর, বুধবার দুপুরে আবারও সিএমএম কোর্টে হাজির করা হয়।

– কোর্টে সেদিন তাঁর পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন এডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক এবং এডভোকেট শিশির মনির।

-আব্দুর রাজ্জাক বলেন, দৈনিক সংগ্রাম অফিসে যেভাবে হামলা ভাংচুর করা হয়েছে, তাতে আমাদেরই মামলা করার কথা। অথচ উল্টা মামলা দেয়া হয়েছে সংগ্রাম সম্পাদকের বিরুদ্ধে। আরও অবাক ব্যাপার হল, আমরা যখন মামলা করতে গেলাম, থানা আমাদের মামলা নিলনা।

– শিশির মনির তার দীর্ঘ শুনানিতে অনেকগুলো পয়েন্ট তুলে ধরেন। প্রথমত, তিনি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুসারে “ডিজিটাল” শব্দের সংজ্ঞা এবং কোন কোন ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্যকর হয় তা ব্যাখা করেন। তিনি বলেন, দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত যে সংবাদকে কেন্দ্র করে এই মামলাটি দেয়া হয়েছে, তা কোনভাবেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় পড়ে না। কারণ সংবাদটি তাদের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত হয় নি। শুধুমাত্র প্রিন্টেড পত্রিকায় ছাপানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত, পেনাল কোডের অধীনে কোন অভিযোগ করতে হলে এফ.আই.আর অবশ্যই ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর হতে হয়। থানার বরাবর কোন এফ.আই.আর হতে পারে না। হলেও সেই অনুযায়ী মামলা হতে পারে না।

– এই পয়েন্টগুলোর বিপরীতে রাষ্ট্র-পক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য ছিল খুবই দুর্বল। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা যুদ্ধাপরাধী বিচারে ফাঁসি হওয়া আসামী আব্দুল কাদের মোল্লাকে শহীদ বলে অভিহিত করা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। এই উক্তির কোন আইনি ব্যাখ্যা অবশ্য তার বক্তব্যে পাওয়া যায় নি। এছাড়াও তিনি দাবী করেন দৈনিক সংগ্রামের অফিসে কোন ভাংচুরের ঘটনা ঘটে নি। যদিও সংগ্রামের আইনজীবীরা ভাংচুরের ছবি এবং ভিডিও আদালতে পেশ করেন।

– সবশেষে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকেও শহীদ বলা হয়। আসলে এই দেশের আইন থেকে এটা স্পষ্ট নয় যে ঠিক কাকে শহীদ বলা যাবে আর কাকে বলা যাবে না। সুতরাং কাউকে শহীদ বললেই আইনত কোন অপরাধ হয় না। অতএব, ৮০ বছর বয়সী এই সম্মানিত প্রবীণ সম্পাদককে জামিন দেয়া হোক।

– শুনানি শেষে জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।

এসময় উচ্চ-আদালত শীতকালীন ছুটিতে থাকায় জামিনের আবেদন নিয়ে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কোন উপায় ছিলোনা।

– উচ্চ-আদালত খোলার সাথে সাথেই ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তাঁর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন এবং এডভোকেট শিশির মনির জামিনের আবেদন পেশ করেন।

-রাষ্ট্র-পক্ষ সেদিন শুনানিতে অংশ না নিয়ে এটর্নি জেনারেলের অনুপস্থিতির কারণ দেখিয়ে এবং প্রস্তুতির জন্য সময় চেয়ে শুনানি পেছানোর আবেদন করেন।

-আদালত ১১ই ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার শুনানির দিন ধার্য করেন।

– ১১ তারিখে, খন্দকার মাহবুব হোসেন এবং এডভোকেট শিশির মনির তাদের শুনানিতে আইনি যুক্তি তুলে ধরেন। দুঃখজনক ভাবে, রাষ্ট্র-পক্ষ আইনি যুক্তির ধার কাছ দিয়ে না গিয়ে আবেগি ও রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে আদালত গরম করে তোলেন। একপর্যায়ে রাষ্ট্র-পক্ষ এবং ডিফেন্স ল’ইয়ারদের কথাকাটাকাটিতে আদালত আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিষয়টি রিজেক্ট হয়ে যায়।

– দৈনিক সংগ্রাম অফিসে হামলা-ভাংচুর বিষয়ে মামলা কেন কোনও থানায় গ্রহণ করা হচ্ছে না, ডিফেন্স ল’ইয়ারদের এই প্রশ্নের সদুত্তর সেদিন কেউ দিতে পারেনি।

– রাষ্ট্র-পক্ষ যেই অভিযোগে গ্রেফতার দেখিয়েছ, সেই অভিযোগের বিচার প্রক্রিয়া শুরু না করে কতদিন উনাকে এভাবে বিনা বিচারে বন্দি রাখা হবে, সেই প্রশ্নেরও কোনও জবাব সেদিন পাওয়া যায়নি।

– নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক “কমিটি টু প্রটেক্ট জারনালিষ্ট” (CPJ) এবং “এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল” সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার আবেদনের প্রতি কোনরকম শ্রদ্ধা না দেখিয়ে, আইনের তোয়াক্কা না করে তাঁকে একরকম জোর করেই বন্দি করে রাখা হয়েছে।

এদিকে স্বাস্থ্য আরও কিছুটা খারাপ হয়ে যাওয়ায় উনাকে কাশেমপুর কারা হাসপাতালে নেওয়া হল।

– কয়েক সপ্তাহ পর কিছুটা সুস্থ হতেই, চিকিৎসকদের নিষেধ স্বত্বেও, তিনি স্বেচ্ছায় হাসপাতাল থেকে তাঁর নির্জন সেলে ফিরে আসেন।

– অভ্যাস মত পড়াশোনা এবং লিখালিখিতে মনোযোগ দেবার চেষ্টা করেন। কিন্তু ডান চোখটা ঝামেলা করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে সব ঝাপসা হয়ে আসতে থাকে।

-গ্রেফতার হবার আগে বাঁ চোখের অপারেশন হয়েছিল। ডান চোখটাও কিছুদিনের মধ্যেই করার কথা ছিল । কিন্তু তার আগেই অস্বাভাবিক ভাবে গ্রেফতার হতে হল।

-করোনার লক-ডাউনের আগে ছোট ছেলেটা প্রতি সপ্তাহেই দেখা করতে আসত। “দেখ আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই হয় না…” – এই বলে তিনিই নিরুপায়-অস্থির ছেলেটাকে সান্ত্বনা দিতেন।

-সেদিন ছেলের সাথে তাঁর মা’ও এসেছিল, দুঃসময়ের নীরব সাথী, সুসময়ের সরব সমালোচক, যার হাত হাতে নিয়ে অর্ধশত বছর দির্ঘ পথ একসাথে চলা । অনেক পুরনো দিনের প্রকাশিত-অপ্রকাশিত লিখাগুলো যত্ন করে সংরক্ষণ করে রেখেছে এখনও। চোখে চোখ পড়তেই, এই কষ্টের মধ্যেও ঠোটে উপচে উঠলো সোনালী হাসি। কিন্তু হাসিটা ঝাপসা ঝাপসা দেখা যাচ্ছে, ডান চোখটার অপারেশন জরুরি হয়ে পড়েছে।

-কখনো নিজের অসুস্থতার কথা কাউকে বলেন না, কিন্তু আজকে চোখটার কথা বলতেই হল। যদি কোন ব্যবস্থা করা যায়।

– পাকস্থলিরও বয়স হয়েছে অনেক, তাই জেলের ভাত গলা দিয়ে ঢুকানোর সময় আপত্তি না করলেও পরে বিপত্তি করে প্রায়। স্যাঁতসেঁতে মেঝের উপর কম্বল, ঠান্ডাটা গায়ে সয়ে গেলেও, বুকে কষ্ট দিচ্ছে খুব । কিন্তু সে কথা চেপে গেলেন কিছুটা।

এরমধ্যে আইনজীবীরা নিম্ন আদালত হয়ে আবার উচ্চ আদালতে জামিনের আবেদন নিয়ে আসার চেষ্টা করে । কিন্তু আল্লাহর কি ইচ্ছা, করোনার লক-ডাউন শুরু হয়ে গেল। সমস্ত আদালত বন্ধ হয়ে গেল।

– জেলগেটও লকড। ছেলেটা কয়েকবার এসে জেল গেট থেকে ফিরে গেল, দেখা হল না। এর কয়েকদিন পর চেষ্টা করেও আর গাজীপুরেই ঢুকতে পারল না। সব বন্ধ। পুরো দেশটাই একটা জেলখানা হয়ে গেছে।

-তবুও জেলে বসে সেলের চার দেওয়ালের বাইরের জেলটার কথা জানতে ইচ্ছে করে। কারা রক্ষীদের কাছে জিজ্ঞেস করলে কিছু কিছু জানা যায়। দোয়া ছাড়া আপাতত দেশের মানুষের জন্য আর কিছু করার নেই।

সমস্ত আদালত বন্ধ। আইনজীবীদের অফিসও বন্ধ। কিন্তু চেষ্টা থেমে নেই, সবারই আশঙ্কা, করোনা নিয়ে, বয়স নিয়ে, শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা নিয়ে, চোখ নিয়ে।

– মে মাসের ৫ তারিখে, এডভোকেট শিশির মনির, সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুবকে সাথে নিয়ে প্রধান বিচারপতির কাছে হাইকোর্টের স্পেশাল বেঞ্চ বসিয়ে শুনানির আবেদন করলেন।

আইনজীবীরা এই বিষয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছেন।

উনি সবসময় বলেন, “চেষ্টা মানুষের কাজ, ফলাফল তো আল্লাহর হাতে” ।

চেষ্টা চলছে একটি ভাল ফলাফলের জন্য। প্রয়োজন সবার দোয়ার। এই পবিত্র রমজানে সকলের দোয়া আল্লাহ নিশ্চয় কবুল করবেন।
দ্বীনী ভাইয়েরা আসুন, আমরা সবাই আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় আবুল আসাদ স্যারের জন্য আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দু’য়া করি ! আমীন।
প্রথমকণ্ঠ / এস এম

সংবাদটি শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন




All rights reserved © Prothom Kantho
Design BY Code For Host, Inc