হাটহাজারীতে বসেছে মানুষের শ্রম কেনা-বেচার হাট

হাটহাজারীতে বসেছে মানুষের শ্রম কেনা-বেচার হাট

মো. আবু শাহেদ, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি:

এটি কোনো অবিশ্বাস্য বিষয় নয়, একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। এভাবেই চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার বেশ কিছু হাটে মানুষ কেনা-বেচা হয়ে থাকে। কৃষি ও গৃহস্থালি কাজে শ্রমিক সংকট থাকায় এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অসহায় গরীব মানুষদের শ্রম কেনা-বেচা হয়।

সরেজমিনে দেখা মেলে হাটহাজারী বড় মাদ্রাসার সামনে কিছু শ্রমজীবী মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে ও বসে রয়েছে। কারো বয়স ৩০, কারো ৪০ কারো বা ৪৫ এর অধিক। ঘড়ির কাঁটা তখন বিকাল ৩টা নাগাদ। একটু পর জমে উঠবে মানুষ কেনা- বেচার হাট, তাই এই দীর্ঘ লাইন।

কথা হয় রংপুর থেকে আসা শ্রমিক হাবিব মিয়ার সাথে। মলিন মুখে তিনি বলেন, বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই সন্তানের সংসারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। করোনার মধ্যেও অনেক দূর থেকে এসেছেন, কিন্তু কাজ মেলেনি, করোনা ভাইরাসের কারণে এই মৌসুমের সিজন খারাপ যাচ্ছে। এ সময় অক্ষেপ করে তিনি বলেন গরিবের আবার শান্তি।

শুধু হাবিব মিয়া নয়, তাদের মতো শত শ্রমিক জড়ো হন এ ‘মানুষ কেনা বেচার হাটে। নিদিষ্ট দামে বিক্রি হন তারা। কাজ পেলে তাদের মুখে হাসি ফুটে, না পেলে মলিন মুখে অপেক্ষা করতে হয় পরবর্তি দিনের জন্য। করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে মানুষ ঘরবাড়ি মেরামত, কৃষিকাজ বা নির্মাণের কাজ করাতে চাচ্ছে না, তাই কৃষি ও মিস্ত্রির কাজে সংকট। তাছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় শ্রমিকের সংখ্যা বেশি হওয়াও অনেকেই বেকার দিন কাটাচ্ছেন।

তথ্যাণুসন্ধ্যানে জানা যায়, হাটহাজারী উপজেলার নাজিরহাট বাজার, কাটিরহাট বাজার, সরকারহাট বাজার, হাটহাজারী বড় মাদরাসায় সামনে, ইছাপুর বাজার, মদুনাঘাট বাজার এলাকায় বসে এই শ্রম কেনা-বেচার হাট।

এখানে আসা শ্রমিকরা জানান, সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে শ্রমিকদের হাটগুলোতে উপস্থিত হতে হয়। সেখান থেকে কাজের প্রয়োজনে ক্রেতারা দরদাম ঠিক করে কাজের জন্য তাদের কিনে নিয়ে যান। স্থানীয় ভাষায়, এ প্রক্রিয়াকে মানুষ কেনা-বেচার হাট বলা হয়।

এছাড়াও বসতবাড়ি ও কৃষিকাজের জন্য দিনমজুর ও শ্রমিক সংকট যেন বেশিরভাগ সময়ই লেগে থাকে। বাড়ি বাড়ি গিয়েও শ্রমিক খুঁজে পাওয়া যায়না। খোঁজ খবর করেও কাজে নেওয়ার জন্য শ্রমিক কিংবা দিনমজুরকে পাওয়া অনেকটা দুষ্কর হয়ে পড়ে। কারণ সবাই একস্থান থেকে অন্যস্থানে কাজে জড়িয়ে পড়েন, কেউ বা কাজের সন্ধ্যানে অন্যত্র চলে যান। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য শ্রমিক ও গৃহকর্তারা সমঝোতা করে শ্রমিকদের একটি নিদিষ্ট স্থানে হাজির হওয়ার জন্য বলে। এতে একদিকে যেমন শ্রমিকদের বেকার থাকার অনিশ্চিয়তা নেই অন্যদিকে গৃহস্থরাও সহজেই পেয়ে যান শ্রমিক। শ্রম কেনা-বেচার এই হাটে শুধু স্থানীয় শ্রমিকই নন, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী, সন্দ্বীপ ও চট্টগ্রামের বাইরে মায়মনসিং, রংপুর, সিরাজগঞ্জ, বরিশাল জেলার বিভিন্ন এলাকার শ্রমিকরা এখানে আসেন।

শ্রম কেনা-বেচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে শ্রমিকরা জানান, গৃহস্থরা দর নির্ধারণ করে বাজার থেকে তাদের নিয়ে যান। তবে এ শ্রম বাজারের অলিখিত শর্ত হচ্ছে শ্রমিককে এক হাট দিবস থেকে পরবর্তী হাট দিবস পর্যন্ত কাজ দিতে হবে। হাট দিবস ছাড়া শ্রমিককে কাজ থেকে বিদায় করা যাবে না। তবে একদিন কিংবা দুই দিনের জন্যও শ্রম কেনার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়াও শ্রমিকদের মজুরি দিতে হবে দৈনিক ৪০০টাকা থেকে ৪৫০টাকা। কিন্তু এই করোনা কালীন সময়ে ৫০০টাকা থেকে ৬০০টাকা পর্যন্ত মজুরি আলোচনায় আসেন। থাকা ও খাওয়াসহ পান বিড়ির খরচ বহন করবে ক্রেতা বা গৃহস্থ। এজন্য শ্রমিক দৈনিক কয়টি পান বা বিড়ি পাবেন তা আগে থেকে আলোচনায় স্থির করে নেওয়া হয়।

মো. আইয়ুব ও জসীমউদ্দীন দিনমজুর শ্রমিক জানালেন, হাটহাজারী উপজেলা সদরে সপ্তাহে দুই দিন রবিবার ও বৃহস্পতিবার এই হাট বসে। অন্য স্থানগুলোতে সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিনও বসে এই হাট। সেখান থেকেই শ্রম কেনা-বেচা হয়। এতে উভয়ই উপকৃত হন। কোনো হাটে একজন শ্রমিকের শ্রম বিক্রি না হলে তাকে ওই দিন বেকার কাটাতে হয়। তখন পরিবার-পরিজন নিয়ে দুর্দশার মধ্যে পড়ে ওই শ্রমিক।

হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন- বিষয়টা জানলাম।দৈনন্দিন কাজে আমাদের অন্যের সহায়তা নিতে হয়।এটাও ঠিক সেরকম। টাকার বিনিময়ে এখানে শ্রমিকের শ্রম বেচাকেনা হচ্ছে।তবে আমার আহবান থাকবে শ্রমিককে কেউ যেনো তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত না করেন। আর শ্রমিক আর মালিকের মাঝখানে আবার যেনো দালাল ঢুকে না পড়ে।

প্রথমকণ্ঠ / এস এম

সংবাদটি শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন




All rights reserved © Prothom Kantho
Design BY Code For Host, Inc