শিরোনাম:
গুজব রোধে কঠোর হচ্ছে সরকার | প্রথমকণ্ঠ

গুজব রোধে কঠোর হচ্ছে সরকার | প্রথমকণ্ঠ

নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রথমকণ্ঠ : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে গুজব ছড়িয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি স্থানে গুজবকে ব্যবহার করে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে বর্তমানে ফ্রান্সে মহানবীর ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন প্রকাশের জের ধরে চলমান ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁঁজি করে গুজব সৃষ্টি, সেগুলো ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে বিদ্বেষ সৃষ্টি করার একটি চেষ্টা চলছে বলে ধারণা করছে গোয়েন্দা সংস্থা।

আর এ কারণেই গুজব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এলক্ষ্যে র‍্যাব-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট তাদের সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করেছে। গুজব ছড়ানো আইডি শনাক্ত করে নেওয়া হচ্ছে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে গুজব সৃষ্টিকারীদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করে তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজার কথাও ভাবছে সরকার।

সূত্র মতে, সম্প্রতি ফ্রান্সে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করায় বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের মুসলিমদের মধ্যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়াও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অজুহাতে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি অপ্রীতিকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার অধিকাংশই ছিল গুজবনির্ভর।

গুজব ছড়িয়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় গরুবাহী কাভার্ড ভ্যান চুরি সন্দেহে পুলিশের উপস্থিতিতে এক যুবককে পিটিয়ে মেরে ফেলে জনতা। চলতি বছরের ১৮ এপ্রিলের এ ঘটনা ঘটে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর মানিকগঞ্জের জাগীর ইউনিয়নে আকিজ টেক্সটাইলের কারখানায় চার সহকর্মী কম্প্রেসার যন্ত্র দিয়ে পায়ুপথে বাতাস দিয়ে নির্যাতন করে জুলহাস নামের এক কর্মীকে হত্যা করে। চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল টাঙ্গাইলের মধুপুরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ছিনতাইয়ের অভিযোগে শাহীন হোসেন নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মসজিদের মাইকে ডাকাত ঘোষণা দিয়ে ২৫ এপ্রিল নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে তুচ্ছ ঘটনার জেরে সুমন নামের এক তরুণকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়।

এমন অনেক নির্মম ঘটনার সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার রাতে যোগ হয়েছে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের সামনে ঘটে যাওয়া জুয়েল হত্যাকাণ্ড। ধর্ম অবমাননার গুজব রটিয়ে আবু ইউনুছ মোঃ গাহিদুন্নবী জুয়েল নামের ওই ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার পর তাঁর লাশও পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। বীভৎস বর্বরতার ঘটনায় হতবাক দেশবাসী।

কখনো সন্দেহ, কখনো ছোট অপরাধ, কখনো বিপদ-শঙ্কার গুজব আবার কখনো তুচ্ছ কারণে বিরোধ-প্রতিহিংসায় মানুষকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা ঘটে চলেছে। কখনো পরিকল্পিতভাবে দলবদ্ধ মানুষ আবার কখনো বিচ্ছিন্ন থেকেও অনেকে হয়ে উঠছে নির্দয় খুনি। দেশে গণপিটুনির নামে নির্যাতনে হত্যার ঘটনা বাড়ছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য মতে, গত ১০ বছরে গণপিটুনির নামে হত্যা করা হয়েছে ৮৯৫ জনকে। গত বছর গুজবে বেড়েছে এমন নৃশংস ঘটনা। চলতি বছরের করোনাকালে অঘোষিত লকডাউনের কারণে কমে গেলেও সম্প্রতি বাড়তে শুরু করেছে। দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারা অনুযায়ী কাউকে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলাও খুন হিসেবে গণ্য হবে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের আলোচিত গণপিটুনির ঘটনারও তদন্ত ও বিচার হয়নি। বেশিরভাগ ঘটনায় সাক্ষী পাওয়া যায় না বলে পুলিশ ‘খুনি’ শনাক্ত না করেই আদালতে প্রতিবেদন দিচ্ছে।

আসকের তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা ৩০। এর মধ্যে খুলনায় ১০ জন, ঢাকায় ৯ জন, রাজশাহীতে তিন, রংপুরে এক, চট্টগ্রামে পাঁচ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুজন নিহত হয়েছে গণপিটুনিতে। ২০১৯ সালে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে হত্যার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫। এর মধ্যে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ২৫ জন এবং ঢাকায় খুন করা হয় ২৪ জনকে। ২০১৮ সালে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছিল ৩৯ জন। এর মধ্যে ঢাকায়ই নিহত হয় সর্বোচ্চ ২১ জন। এর আগে ২০১৭ সালে ৫০ জন, ২০১৬ সালে ৫১ জন, ২০১৫ সালে ১৩৫ জন এবং ২০১৪ সালে ১১৬ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের বরাত দিয়ে আসকের আরেকটি হিসাবে দেখা গেছে, ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছে ৮০০ জন। এই হিসাবে ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত (সেপ্টেম্বর) এ ধরনের ঘটনায় নিহত হয়েছে ৮৯৫ জন।

প্রায়ই সামান্য কারণে বা অপরাধের অভিযোগ তুলে নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়ে হত্যার অভিযোগ পাওয়া যায়। গত ১১ সেপ্টেম্বর বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলায় গরুচোর সন্দেহে এলাকাবাসী পিটিয়ে কাজী উজ্জ্বল হোসেন নামের এক যুবককে মেরেই ফেলে। গত বছর ছেলেধরা গুজবে সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়েপড়া গণপিটুনির কবল থেকে রেহাই পায়নি সাধারণ পথচারী, নিরপরাধ ব্যক্তি, মানসিক প্রতিবন্ধী, ভবঘুরে নারীও। পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা ও রক্ত লাগবে, তাই মানুষকে গুম করা হচ্ছে এমন গুজবে জুলাইয়েই পিটিয়ে মারা হয় ১৭ জনকে। ২০ জুলাই রাজধানীর উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সন্তানের ভর্তির খোঁজ নিতে গিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে প্রাণ হারান তাছলিমা রেনু নামের এক নারী। এই ঘটনায় দেশব্যাপী ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছিল।

সম্প্রতি গত ২৯ অক্টোবর লালমনিরহাটে মসজিদে পবিত্র কোরআন শরিফ অবমাননার গুজব ছড়িয়ে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা ও মরদেহ আগুনে পোড়ানোর ঘটনা ঘটে। যদিও পরবর্তীতে স্থানীয়রা বলেন নিহত ব্যক্তি ধার্মিক ছিলেন।

এর আগে বেশ কয়েকবার কক্সবাজারের রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ রোববার বিকেলে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে কুমিল্লার মুরাদনগরে সাতটি ঘরে আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ অভিযোগে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তাই আর কেউ যাতে এমন গুজবের শিকার না হয় সেজন্য কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ফেসবুকের বড় বড় গ্রুপ এবং পেইজের পোস্টে নজরদারি শুরু করেছে। কোনো আক্রমণাত্মক ও রাষ্ট্রবিরোধী পোস্ট দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ফেসবুকের কাছে পোস্ট মুছে দেওয়ার আবেদন করছেন তারা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গুজব ছড়িয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির অপচেষ্টা এর আগেও হয়েছে। তাই আর যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় সে লক্ষ্যে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হতে পারে।

র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, র‍্যাবের একটি দক্ষ ও চৌকস সাইবার মনিটরিং টিম রয়েছে। তারা সার্বক্ষণিক সব সামাজিক মাধ্যমে নজরদারি করছে। যদি কেউ গুজব সৃষ্টির চেষ্টা করে তাকে দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় নেওয়া হবে। এছাড়াও সাধারণ মানুষ যে কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে র‍্যাবের ভেরিফাইড পেজে জিজ্ঞাসা করতে পারেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মোঃ সোহেল রানা বলেন, গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। পাশাপাশি জনগণকে অনুরোধ জানানো হয়েছে যাতে কোনো ধরনের গুজবে কান না দিয়ে তথ্যের সত্যতা যাচাই করে। কেউ যদি গুজবের মাধ্যমে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায় তার বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে চলতি বছরের মার্চে গুজব বন্ধে কয়েকটি নির্দেশনাও দিয়েছিল হাইকোর্ট। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, পুলিশের প্রত্যেক সার্কেল অফিসার (এএসপি) তার অধীনের প্রতিটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে ছয় মাসে অন্তত একবার গুজবকে কেন্দ্র করে গণপিটুনি প্রবণতার বর্তমান অবস্থা নিয়ে মিটিং করবেন। গুজব এবং গণপিটুনির বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচার কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। সামাজিক মাধ্যমে যে কোনো ধরনের অডিও, ভিডিও, খুদেবার্তা যা গুজব সৃষ্টি বা গণপিটুনিতে মানুষকে উত্তেজিত করতে পারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা বন্ধের ব্যবস্থা নেবে। যারা এসব কাজে জড়িত তাদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে। যখনই গণপিটুনির ঘটনা ঘটবে, কোনোরকম দেরি না করে তখনই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রাথমিক তদন্ত এফআইআর নিতে বাধ্য এবং তা সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারকে অবহিত করবেন।

প্রথমকণ্ঠ / এস এম

সংবাদটি শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন




All rights reserved © Prothom Kantho
Design BY Code For Host, Inc